বাবা হারানোর ১০ বছর

বাবা হারানোর ১০ বছর ছিল রোববার। প্রতিটি কাজকর্মে তাকে স্বরণ করি। আমার দেখা তিনি ছিলেন এক নির্ভীক কলম যুদ্ধা। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নেওয়া অনেকেই সময়ের সঙ্গে বদলে যান। কেউ আপস করেন, কেউ কান্ত হয়ে পড়েন, কেউবা মতার ছায়ায় নিজেকে নিরাপদ রাখেন। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের কাছে সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়; একটি আদর্শ, একটি দায়, আজীবনের অঙ্গীকার। আমার বাবা কাজী মোদাচ্ছের হোসেন সুলতান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক-এ সাংবাদিকতা করেছেন তিনি। আমৃত্যু ছিলেন এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কর্মজীবনের সময়কালে আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী অঞ্চলজুড়ে তিনি ছিলেন একমাত্র নির্ভীক ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত।

সাংবাদিকতার শুরুটা হয়েছিল ঢাকায়। দৈনিক ইত্তেফাকের আগে তিনি কাজ করেছেন দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। সে সময়ের সাহিত্য-সাংবাদিকতার জগতে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। প্রখ্যাত লেখক আকরাম খাঁ ও কবি বেনজীর-এর মতো গুণীজনদের সঙ্গে ঢাকায় লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডায় যুক্ত ছিলেন তিনি।

কিন্তু শহরের আলো-ঝলমলে সাংবাদিকতার জীবন ছেড়ে একসময় তিনি ফিরে আসেন নিজের মাটিতে; আড়াইহাজারে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় সমস্যা, অনিয়ম, অন্যায় আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর কলম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর লেখায় উঠে আসত সমাজের অসঙ্গতি, মতার অপব্যবহার, প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার গল্প। কোনো রক্তচক্ষুকেই তিনি ভয় পাননি।
এই নির্ভীকতার মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। জীবনে একাধিকবার হত্যা চেষ্টার শিকার হয়েছেন তিনি। হুমকি, ভয়ভীতি; কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। সাংবাদিকতার নৈতিকতা আর সত্যের পে দাঁড়ানো থেকে একচুলও সরে যাননি কাজী মোদাচ্ছের হোসেন সুলতান।
সহকর্মীরা বলেন, “তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি জানতেন সত্য বলার মূল্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তবু কখনো আপস করেননি।”

শুধু সাংবাদিকতা নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় সহযোগিতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ; সবখানেই তাঁর নিঃশব্দ উপস্থিতি ছিল। প্রচারের আলোয় না এসেও সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়াটাই ছিল তাঁর স্বভাব।

২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঘুমের মধ্যেই থেমে যায় এই নির্ভীক কলমযোদ্ধার জীবন। ছোট মেয়ে ফরিদার চিৎকারে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর মৃত্যুর খবর। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকেরা এসে তাঁকে দেখে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৎকালীন টিএইচও ডা: হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া প্রায় আট কিলোমিটার দূর থেকে এসে প্রবীণ এই সাংবাদিকের মৃত্যু ঘোষণা করেন।

খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দিনভর দেশ-বিদেশ থেকে অবিরাম ফোন আসতে থাকে। শুভাকাক্সক্ষী, সহকর্মী ও পাঠকদের শোক আর ভালোবাসায় ভরে ওঠে তাঁর বাড়ি। বাদ আছর অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে সেই জানাজা পরিণত হয় এক নীরব শ্রদ্ধা-সমাবেশে। আশপাশের সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় মানুষের ঢলে।

বাবার দেখানো পথ ধরেই সাংবাদিকতায় এসেছি । বর্তমানে আড়াইহাজার থানা প্রেস কাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বাবার আদর্শ আর নির্ভীকতার উত্তরাধিকার বহন করে তিনি এগিয়ে চলেছেন আজও।

গতকাল রোববার ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি কাজী মোদাচ্ছির হোসেন সুলতানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। সময় পেরিয়েছে, কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর সাহস আর তাঁর নৈতিক অবস্থান এখনো আড়াইহাজারের সাংবাদিকতার মানচিত্রে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন; সাংবাদিকতা যদি সত্যের পে দাঁড়ায়, তবে একটি কলমই হয়ে উঠতে পারে সমাজ বদলের শক্তিশালী হাতিয়ার। আল্লাহ পাক ওনাকে জান্নাত দান করুন।