ওবায়দুল কাদেরের খেলা শেষ

বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন মোকাবিলা করতে এক সময় ‘খেলা হবে’ বলেছিলেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। পরে সেই স্লোগানকে জাতীয় রাজনীতির মাঠে ছেড়ে তুমুল বিনোদন আর হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এখন রাজনীতির মাঠে তারই ‘খেলা’ শেষ। ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বনে যাওয়া এই নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এখন ‘রেফারি’র শেষ বাঁশি বেজে গেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছেন, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে দল পুনর্গঠনের নানারকম নির্দেশনা দিচ্ছেন। তবে দল পুনর্গঠনে তার পরিকল্পনার কোথাও ওবায়দুল কাদের নেই।

শেখ হাসিনা বরং ওবায়দুল কাদেরের মতো ‘ফ্যাশন সচেতন ও বাচাল’ নেতার বদলে প্রয়াত জিল্লুর রহমান বা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো ‘ভদ্র, নিষ্ঠাবান ও সংকটের কাণ্ডারি’ সাধারণ সম্পাদক খুঁজছেন।

কলকাতা, লন্ডন আর নিউইয়র্কে অবস্থান করা অন্তত আধা ডজন আওয়ামী নেতা টাইমস’কে বলেন, দলে ওবায়দুল কাদের এখন পুরোপুরি ‘নিঃসঙ্গ’। কেউ তার খোঁজও রাখে না। কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী ইসরাতুন্নেসা কাদেরকে নিয়ে এখন তার অলস ও ‘নস্টালজিক’ সময় কাটছে।

এক সময় যে ওবায়দুল কাদেরের দর্শন পাওয়ার জন্য নেতাকর্মীরা উন্মুখ হয়ে থাকতেন, আজ কলকাতায় তারই পাশাপাশি ভবনে থাকা ঢাকার এক সাবেক সংসদ সদস্য টাইমসকে জানান, হাতেগোনা কয়েকজন সুবিধাভোগী ছাড়া সবাই এখন এই ‘ফ্যাশন আইকন’কে এড়িয়ে চলছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওবায়দুল কাদেরের এই চরম দুর্দিনে কেবল গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী এবং টাঙ্গাইল-২ আসনের সাবেক এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির মাঝেমধ্যে তার খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ছোট মনিরের স্ত্রী ঐশী খান আবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের একমাত্র কন্যা।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রীত্ব পাননি ওবায়দুল কাদের। তখন প্রায়ই দলের নতুন নেতাদেরকে প্রায়ই ‘কাউয়া’ ডাকতেন তিনি। এজন্য তাকেই আড়ালে-আবডালে ‘কাউয়া কাদের’ ডাকতে শুরু করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সেই ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক হয়ে ‘হাইব্রিড’ বা ‘নব্য আওয়ামী লীগারদের দলে জায়গা দিয়ে সমালোচিত হন।

কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা টাইমসকে জানান, ওবায়দুল কাদেরের ওপর কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা শুধু বিরক্তই নন, রীতিমতো ক্ষুব্ধ। দল ক্ষমতায় থাকাকালে ত্যাগীদের উপেক্ষা করে ‘হাইব্রিড’দের লাইমলাইটে আনা, উপ-কমিটির পদ নিয়ে ‘বাণিজ্য’, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও মডেলদের সঙ্গে মাখামাখি এবং যাত্রার ঢংয়ে অতিকথন দিয়ে রাজনীতিকে বিনোদনে রূপ দেওয়ার দায় তার ওপরই চাপাচ্ছেন সবাই।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ-বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে উসকানিমূলক নির্দেশনা দিয়ে যে অস্থিরতা তিনি তৈরি করেছিলেন, তার খেসারত আজ পুরো দলকে দিতে হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও কখনো হাসির খোরাক, কখনো বিরক্তি উৎপাদন করেছেন ওবায়দুল কাদের। একজন সাবেক সংসদ সদস্য টাইমস’কে বলেন, ‘তিনি যখন মন্ত্রী ছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন একেক ঢংয়ে, একেক রঙের ‘মুজিবকোট’ পরা ছবি আসত। দলের নেতাকর্মীরা মনে মনে হাসলেও, প্রকাশ্যে তার সুনজরে থাকার জন্য লাইক-কমেন্ট আর প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিত। এই চাটুকারিতার আড়ালে যে সংগঠন দিন দিন ফাপা হয়ে যাচ্ছিল, তা বোঝার ক্ষমতা ওবায়দুল কাদেরের ছিল না। ফলে, পতনের পর দল আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না।’

গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর ঢাকা থেকে পালিয়ে সস্ত্রীক কলকাতায় আস্তানা গাড়েন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু সেখানে গিয়েও ভাগ্য খোলেনি। গত দুই বছরে দলের কোনো ভার্চ্যুয়াল সভা কিংবা কলকাতার বিভিন্ন গোপন স্থানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের যেসব ‘চা-চক্র’ বা বৈঠক হয়েছে, তার একটিতেও দাওয়াত পাননি ওবায়দুল কাদের। বরং দলের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য কড়া নজরদারি রাখছেন, যাতে কেউ ভুল করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে।

ছাত্রনেতা থেকে একটি সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ার সামলানো এক আওয়ামী লীগ নেতা, যিনি বর্তমানে কলকাতায় আছেন, টাইমস’কে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে কোনো কদর না পেয়ে ওবায়দুল কাদের এখন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এক বছর আগে স্বয়ং নেত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ওবায়দুল কাদের সেই ডাকে সাড়া দেননি। অবশ্য সেটি ভয়ে নাকি অভিমানে-তা জানা যায়নি।

বর্তমানে কলকাতার হাসপাতালের রুটিন চেকআপ ছাড়া ফ্ল্যাটের বাইরে পা-ও রাখেন না ওবায়দুল কাদের। টাইমস-এর পক্ষ থেকে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল এবং মেসেজ পাঠানো হলেও ওপার থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।

রাজনীতির মাঠে যতই একাকীত্ব থাকুক, দেশের আইনি মাঠে অবশ্য আলোচনায় আছেন ওবায়দুল কাদের। দেশজুড়ে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা ঝুলছে। অনেক মামলার বিচার কাজও চলছে। তার অনুপস্থিতিতেই এসব মামলায় রায় দেবে আদালত। সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ