পূর্বপশ্চিম এক্সপ্লেইনার

আসছে ‘বুন্দিবুগিও’ মহামারি, মৃত্যু নিশ্চিত!

করোনা মহামারীর সেই দিনগুলোর কথা মনে আছে? চারদিকে আতঙ্ক, লকডাউন আর একটা ভ্যাকসিনের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা। কিছুদিনের মধ্যে হয়তো তেমনই এক নতুন আতঙ্ক ধেয়ে আসছে! যার নাম ‘বুন্দিবুগিও’। এটি ইবোলা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট।

করোনার মতো এটি বাতাসে না ছড়ালেও, এর ভয়াবহতা কম নয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—করোনার শুরুর দিনগুলোর মতো এই ভাইরাসেরও এখন পর্যন্ত কোনো টিকা বা ওষুধ নেই।

মাত্র অল্প কয়েকদিনে কঙ্গোতে এই ভাইরাসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আফ্রিকার এই মরণব্যাধি যেকোনো দিন আমাদের দোরগোড়ায় চলে আসতে পারে। আসুন, জেনে নেওয়া যাক নতুন এই ভাইরাসটি আসলে কী এবং কেন এটি নিয়ে আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।

বুন্দিবুগিও ইবোলা কী?
ইবোলা মূলত একটি বিরল এবং অত্যন্ত মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাস। এটি সরাসরি মানুষের রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়।
১৯৭৬ সালে কঙ্গো এবং সুদানে প্রথম এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ফ্রুট ব্যাট বা শিম্পাঞ্জি থেকে এটি প্রথম মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছিল।
তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক তৈরির পেছনে রয়েছে ইবোলার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘বুন্দিবুগিও’।
২০০৭ সালে উগান্ডার বুন্দিবুগিও জেলায় প্রথম ইবোলার এই নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হয়। সেই জেলার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে।

বুন্দিবুগিও কেন আলাদা?
ইবোলার সবচেয়ে পরিচিত ভ্যারিয়েন্ট ‘জায়ার’ স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর টিকা থাকলেও, বুন্দিবুগিও-র জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো টিকা বা ওষুধ নেই। তবে স্বস্তির খবর হলো, এটি জায়ার স্ট্রেইনের তুলনায় কিছুটা কম প্রাণঘাতী। যেখানে জায়ার স্ট্রেইনে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার ৯০% পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে বুন্দিবুগিও-তে এই হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। কিন্তু বিপত্তি অন্য জায়গায়। বুন্দিবুগিও ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর খুব ধীরে ধীরে নিজের সংখ্যা বাড়ায় এবং শরীরের কোষগুলোকে আক্রমণ করতে সময় নেয়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশের সময় সাধারণত ৮ থেকে ১০ দিন, তবে এটি ২১ দিন পর্যন্তও হতে পারে। এই ধীরগতির কারণেই এটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায়?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি কি করোনার মতো বাতাসে ছড়ায়? না, ইবোলা বায়ুবাহিত কোনো ভাইরাস নয়।
এটি কেবল আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, কিংবা মলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। শুধু তাই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুঁই বা কাপড় থেকেও এটি ছড়াতে পারে।
হাসপাতাল কর্মী এবং যারা আক্রান্ত রোগীর সেবা করেন, তাদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কঙ্গোতে কর্মরত একজন মার্কিন চিকিৎসকও সম্প্রতি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

বুন্দিবুগিও ইবোলার লক্ষণসমূহ
বুন্দিবুগিও ইবোলার প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ, যা আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। সংক্রমণের শুরুতে প্রচণ্ড জ্বর, ক্লান্তি, পেশি ব্যথা, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা দেখা দেয়। ঠিক যেন সাধারণ কোনো ফ্লু বা ম্যালেরিয়া। কিন্তু কয়েকদিন পর শুরু হয় আসল বিভীষিকা। আক্রান্ত রোগীর বমি, ডায়রিয়া এবং শরীরের ভেতর ও বাইরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ধীরে ধীরে রক্তনালীগুলো ফেটে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটে।

কোথায় কোথায় শনাক্ত হয়েছে?
বর্তমানে এই ভাইরাসের কেন্দ্রস্থল হলো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো এবং উগান্ডা। প্রাদুর্ভাব ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে কঙ্গোতে এক হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এ পর্যন্ত অন্তত ২৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কঙ্গোর সীমানা পেরিয়ে ভাইরাস ছড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও। উগান্ডায় ইতোমধ্যে নয়জনের দেহে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং একজন মারা গেছেন। এছাড়া আফ্রিকার বাইরে, ব্রাজিলের সাও পাওলোতে একজন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যিনি সম্প্রতি কঙ্গো থেকে ফিরেছিলেন।

টিকা নেই, আবিষ্কার কত দূর?
বুন্দিবুগিও-র কোনো স্বীকৃত টিকা না থাকলেও ইতোমধ্যে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। ৬০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি অর্থায়ন নিয়ে তিনটি প্রধান টিকা এখন গবেষণার টেবিলে।
ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ (আইএভিআই), অক্সফোর্ড এবং মর্ডানা- এই তিনটি প্রতিষ্ঠান বুন্দিবুগিও-র টিকা উদ্ভাবনে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আইএভিআই এর তৈরি টিকা। তবে এটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হতে আরও ৯ মাস সময় লাগতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবন্ত এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিটি দিন মূল্যবান।

বর্তমানে কীভাবে চিকিৎসা চলছে?
যেহেতু বুন্দিবুগিও-র সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীদের বর্তমানে ‘সাপোর্টিভ কেয়ার’ বা লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যেমন—রোগীর শিরায় স্যালাইন দেওয়ার মাধ্যমে শরীরের তরল ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রক্তচাপ ঠিক রাখা, জ্বর, ব্যথা, বমি এবং ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংক্রমণ যেন কোনোভাবেই ছড়াতে না পারে, সেজন্য রোগীকে আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন শঙ্কার?
এখন আপনারা হয়তো ভাবছেন, আফ্রিকা বা ব্রাজিলের এই রোগ নিয়ে বাংলাদেশের কেন দুশ্চিন্তা করতে হবে?

মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য বিরাট সতর্কবার্তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই একে ‘পিএইচইআইসি’ বা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

এই ভাইরাসটি ‘বায়োসেফটি লেভেল ৪’ বা সর্বোচ্চ জৈব নিরাপত্তা স্তরের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বায়নের এই যুগে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করছে, সেখানে কোনো দেশই আসলে ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামান্য অসতর্কতা এই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে করোনার মতো আমাদের দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে পারে। যেহেতু এর কোনো টিকা নেই, তাই এটি আমাদের দেশে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।