একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতি এখন বেশ উত্তপ্ত। এর মধ্যেই বিশ্বমঞ্চে একটি নতুন রসায়ন সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। সেটি হলো রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তি নয়। বরং এটি তৈরি হয়েছে একে অপরের অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং আমেরিকার আধিপত্যকে টেক্কা দেওয়ার যৌথ স্বার্থ থেকে। যদিও এই সম্পর্কে চীনের পাল্লাই বেশি ভারী, তবুও লাভ হচ্ছে দুই পক্ষেরই।
আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তা এই দুই পরাশক্তিকে আরও কাছাকাছি এনেছে। ওয়াশিংটনকে সামলানোর জন্য মস্কো ও বেইজিং এখন একে অপরের কাঁধে হাত বাড়িয়েছে।
রাশিয়ার কেন চীনকে দরকার?
২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আক্রমণ করে, তখন পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। ইউরোপের বড় বাজারগুলো রাশিয়ার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক তখনই রাশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় চীন। বর্তমানে চীনই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
বাণিজ্যের জোয়ার: মাত্র কয়েক বছরে দুই দেশের বাণিজ্য আকাশ ছুঁয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বছরে ২৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
প্রযুক্তির জোগান: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া যেসব প্রযুক্তি পাচ্ছিল না, তার ৯০ শতাংশেরই জোগান দিচ্ছে চীন। এর মধ্যে ড্রোন উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশও রয়েছে।
জ্বালানি তেলের নতুন ঠিকানা: ইউরোপ যখন রুশ তেল কেনা বন্ধ করে দিল, তখন চীন হয়ে উঠল রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। এর ফলে যুদ্ধের বাজারেও রাশিয়ার অর্থনীতি সচল রয়েছে।
চীনের কেন রাশিয়াকে দরকার?
চীনের মোট বাণিজ্যের তুলনায় রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য মাত্র ৪ শতাংশের মতো, যা বেশ কম। তবে বেইজিংয়ের কাছে রাশিয়ার গুরুত্ব বাণিজ্যের চেয়ে কৌশলের জায়গায় অনেক বেশি।
নিরাপদ জ্বালানি পথ: মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীতে প্রায়ই উত্তেজনা লেগে থাকে। সমুদ্রপথে তেল আনা তাই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু রাশিয়ার সাথে স্থলপথ থাকায় চীন খুব সহজেই এবং নিরাপদে জ্বালানি আমদানি করতে পারছে।
পাইপলাইন পরিকল্পনা: দুই দেশের মধ্যে এখন ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি সফল হলে মঙ্গোলিয়ার ওপর দিয়ে প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার রুশ গ্যাস সরাসরি চলে যাবে চীনে।
জাতিসংঘে এক জোট: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দুই দেশই প্রায় সমমনা। আমেরিকার নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা প্রায়ই একসাথে অবস্থান নেয়।
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
বাইরে থেকে দেখতে যতই ঘনিষ্ঠ মনে হোক না কেন, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই। তারা যৌথ নৌ মহড়ার মতো সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে ঠিকই, তবে বিপদে পড়লে একে অপরকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।
দুই দেশের শীর্ষনেতারা একে অপরকে প্রকাশ্যে ‘বন্ধু’ বলে ডাকেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বন্ধুত্ব কোনো আদর্শগত মিল থেকে আসেনি, এসেছে বাস্তব প্রয়োজনে। আর এই ব্যবহারিক সুবিধার কারণেই সম্পর্কটি বেশ নমনীয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—যতদিন পর্যন্ত দুই দেশের স্বার্থ এক থাকবে।











