যেভাবে রক্তের দামে অর্জিত হলো বাংলা ভাষা

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস। পৃথিবীর আর কোনো দেশে মাতৃভাষার দাবিতে এমন রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের নজির নেই। শুধু বাঙালি জাতিরই রয়েছে এই গৌরব, যেখানে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেছেন দেশের দামাল সন্তানেরা। রক্তে অর্জিত এই মাতৃভাষা বাংলা জাতির অস্তিত্ব, চেতনা ও স্বাধীনতার ভিত্তি।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। যেমন গৌরবোজ্জ্বল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ফেব্রুয়ারি ও ডিসেম্বর এই দুই মাসের দুই দিন বাঙালি জাতির কাছে অবিস্মরণীয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে জাতির সূচনা, আর ষোলই ডিসেম্বরে সেই জাতির পূর্ণতা। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে প্রতিবাদের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মহীরুহে পরিণত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সচেতন জনতার সংগঠিত প্রতিবাদ। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে রূপ নেয় মুক্তিযুদ্ধের মহাপ্লাবনে। একাত্তরের বিজয় তারই সফল পরিণতি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একুশের শহীদরাই ছিলেন এই অগ্রযাত্রার প্রথম পথিকৃৎ। শহীদ বরকত, সালাম, রফিক ও জব্বার ছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনার অগ্রসেনানী, যাঁদের আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরভাস্বর।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ধারা। উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে ভাষার প্রশ্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হয়েছে, সেখানে পূর্ব বাংলায় ভাষার দাবি উঠে এসেছে মাতৃভাষার স্বাভাবিক টান থেকে। অল ইন্ডিয়ায় ভাষা ধর্মভিত্তিক বিভেদের জন্ম দিলেও পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষাই হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত নেহরু রিপোর্টে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দির সুপারিশ করা হয়। এই কমিশনের সভাপতি ছিলেন কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহরু এবং সম্পাদক ছিলেন তাঁর পুত্র জওহরলাল নেহরু। এই সুপারিশের ভিত্তি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের অ-হিন্দি ভাষাভাষী অঞ্চল এবং মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

মুসলমানদের তীব্র আপত্তির মুখে মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী হিন্দুস্থানী ভাষার প্রস্তাব দেন, যেখানে দেবনাগরী হরফে লিখলে হিন্দি এবং আরবি হরফে লিখলে উর্দু হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়। তাতেও বিতর্কের অবসান না হলে শেষ পর্যন্ত তিনি হিন্দি-হিন্দুস্থানী রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাব দেন।
পরে হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার বিপরীতে মুসলমানদের পক্ষ থেকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালো হয়। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর এই দাবি আরও প্রবল আকার ধারণ করে। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের নেতারাও এ দাবিতে সোচ্চার হন। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক জিয়া উদ্দিন আহমেদ যুক্তি তুলে ধরেন যে, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যদি হিন্দি হয়, তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই ভাষা সংকট আরও তীব্র হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী অতীত স্মৃতিকে পুঁজি করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝতে পারে, উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনে তারা মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে। তবুও শাসকগোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তে অটল থাকে।

এই উদ্ধত ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত প্রতিবাদই ছিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষ প্রমাণ করে দেয়, মাতৃভাষার অধিকার ছিনিয়ে নিতেই তারা প্রস্তুত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলে। তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে যে দাবি সূচিত হয়েছিল, তা পরে বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীদের হাত ধরে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার জনগণকে রাজনৈতিক সচেতনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের পথ সুগম করে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত জন্ম দেয় স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

মহান একুশে আজ আর শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো-এর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মাতৃভাষা ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ভাষা শহীদ বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিকসহ অসংখ্য নাম না জানা সংগ্রামীকে। তাঁদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই বাংলা আজ বিশ্বসভায় গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত একটি ভাষা।