Article featured media

শফিক হাসানের একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুমের বাদ্যে রাষ্ট্র নাচে’। যেখানে প্রাত্যহিক জীবনের টানাপোড়েন, আত্মশ্লাঘা, দুঃখ-জরা, যন্ত্রণা-লাঞ্ছনা-ব্যঞ্জনা উঠে এসেছে। নামের মধ্যেই একটা ভাবনা বা দেশ নিয়ে চিন্তা আছে। সমাজের প্রাত্যহিক চিত্র আছে। এমন নাম কবির মাথায় কীভাবে এসেছে ভেবে পাই না।

‘মৃত্যুক্ষুধা’ কবিতায় এক হোটেল বয়কে দিয়ে ভয়ংকর একটি কথা খুব সাধারণভাবে বলে ফেলেছেন কবি, ‘হাসে সে—রাগ কইরা লাভ কী? থুতু মিশাইয়া দিই/ সুযোগ পাই না বইলা শুধু মুত ছোঁয়াইতে পারি না।’ কী ভয়ংকর কথা! ভাগ্যিস আমি কোনো হোটেল বয়কে ঝাড়ি-টাড়ি দিই না। নয়তো আমার খাবারে কোনদিন ডালের সঙ্গে মুত মিশিয়ে দেয়! ‘যে ক্ষুধা আমাদের তাড়িত করে, পীড়ন দিয়ে যায় নিয়ত/ একদিন আমরাও ক্ষুধাকে বুড়ো আঙুল দেখাবো, আচ্ছা করে!’ কবে দেখাব কবি? মৃত্যুর পর? ক্ষুধার প্রতি মনে হয় কবির অসীম ক্রোধ।

‘লঘু-গুরুর অঙ্ক’ কবিতায় লিখেছেন, ‘অঙ্কের হিসাবে কীভাবে নির্ণিত হবে মানুষের ঠিকানা!’ কবিতাটি পড়লে বুঝতে পারবেন এই কথার মূল্য। সারাজীবন সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু নিয়ে ট্রাম্পকার্ড খেলা হয়েছে। রাজনীতিবিদরা এটা খেলে বেশ আনন্দ পান। কিন্তু সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সবাই যে মানুষ, তা নিয়ে কারো ভাবার সময় নেই।

‘মৃত্যু সংবাদ’ এমন সহজ-সরল কবিতা, মন ছুঁয়ে যায়। সহজভাবে সমাজকে গভীর বার্তা দেয়। দেশ নিয়ে গভীর চিন্তা ফুটে ওঠে কবিতায়। প্রতিদিনই মাইকে কোনো না কোনো মানুষের মৃত্যুর খবর প্রচার করা হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ করছে। কিন্তু প্রতিদিন দেশটা একটু একটু করে মরে যাচ্ছে, নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কি তার জন্য মাইকিং করছে? করছে না।

একটি সাধারণ কথাকে অসাধারণভাবেও বলা যায়। তার একটি প্রমাণ ‘বহ্নুৎসব’ কবিতা। ‘পুড়ে যেতে যেতে অঙ্গার হতে হতে/ অনুভব হলো একদিন—/ সোনায় রূপান্তরিত হওয়াই/ সার কথা নয়/ ছাইয়েরও রয়েছে/ সমান মূল্য!’ লেখাটি এতটাই ভালো লেগেছে, একবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। সাধারণত আমি ফেসবুকে তেমন একটা পোস্ট দিই না। মন পুলকিত হওয়ার মতো। ছাড়িয়ে যায় চিন্তার ঘ্রাণ।

‘নগর সম্বন্ধীয়’ পরিবহন সেক্টরের ইতিকথা নিয়ে কবিতা, যা আমার লেখার কথা আছে কিন্তু কবি আগেই লিখে ফেলেছেন। কাজটা ঠিক হয়নি। পরিবহন ও প্রশাসন তলে তলে মাসতুতো ভাই ও দুর্বৃত্ত চক্র। সেক্টরটা আর ভালো হলো না। ‘আরেকটা গণজাগরণ আসলেই প্রয়োজন। নইলে কে সারাবে ক্ষত, কে দেবে পথের দিশা!’ কবির ‘ঘুমের বাদ্যে রাষ্ট্র নাচে’ কাব্যগ্রন্থটি ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালে একটি গণজাগরণ হয়েছে। এখন ২০২৬ সাল। এই দুই বছরে কি কোনো ক্ষত সেরেছে, কেউ কি পথের দিশা দিতে পেরেছেন?

‘শাঁখের করাত’ কবিতায় বলা হয়েছে, ‘নির্বোধই জানে প্রেমের মূল্য, বিরহের নোনাস্বাদ’। উত্তম কথা। প্রেমে যে পড়ে; অন্যের চোখে সে বোকা ও নির্বোধই হয়। হাসিও পায়। ‘শাঁখের করাত’ যথার্থ নাম হয়েছে। কবি যেন আমার জীবনের কথাই বলে দিয়েছেন এ কবিতায়। ‘জাগরণ’ কবিতায় বলা হয়েছে, ‘কবি ঘুমিয়ে পড়লে/ জেগে ওঠে অন্ধকার’। শুধু এ কথার জন্যই মনে হয় বারবার লেখা উচিত। আমি না লিখলে অন্ধকারের জন্ম হবে। জন্ম হবে শত হায়নার। রক্তাক্ত করবে। দেশটাকে মেরে ফেলবে।

‘কোনো এক মাসে বেতন না পেলে/ পকেট চুপসানো থাকলে সুস্বাস্থ্য টেকে না’। মোক্ষম কথা। মধ্যবিত্ত পরিবারে মাসের বেতন যে মহার্ঘ্যর মতো; তা শিল্পপতিদের বোঝানো কঠিন। এক বেতনকে কেন্দ্র করে মানুষের কত স্বপ্ন থাকে, পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু শেষে যখন বেতন হয় না; তখন এর চেয়ে অমানবিক কষ্ট আর হয় না। আত্মশ্লাঘায় ভুগতে হয়।

‘ঘুমের বাদ্যে রাষ্ট্র নাচে’ রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে কবির বিদ্রূপাত্মক কবিতা। রাষ্ট্রের সবাই যেন ঘুমের ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। যেন এই রাষ্ট্রের আর কিছুই করার নেই ঘুম ছাড়া। ঘুমের তালে তালে যেন সবকিছু চলছে। জেগে ওঠার কোনো লক্ষণই নেই। ৫৫ বছর ধরে এভাবেই দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এ জন্য কবি বলেছেন, ‘কবি ঘুমিয়ে পড়লে জেগে ওঠে অন্ধকার’। তাই তো ‘অন্ধ বাউল’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘কী চক্ষু দিল মাবুদ/ ক্রমাগত খুঁজে চলে/ চেনা পৃথিবীর অচেন রূপ।’ কী চক্ষু দিলো মাবুদ! একই অন্তরে সরল ও গরল। কী অন্তর দিলো মাবুদ! একই মুখে মিষ্টি ও বিষ, সত্য ও মিথ্যা। কী মুখ বানাইলা মাবুদ!

কিছু কবিতা ভাব-ভান্ডারে ভরপুর। যেমন- এক দুই তিন, ছিদ্রান্বেষী, মাসিবাড়ি, ল্যাম্পপোস্ট, জঠর, দুর্ভিক্ষ, কেন তবে আসা-যাওয়া, ছিন্ন আঁচল, শাহবাগ ২০১৩, কে আপন কে পর, ছিন্ন আঁচল, স্টেশনে পৌঁছাতে পারি না কেন। ‘ঘুমের বাদ্যে রাষ্ট্র নাচে’ বইটি সমাজের প্রাত্যহিক জীবনসম্বন্ধীয় চিত্র। যেটি পাঠক জীবনের সাথে মিল খুঁজে পাবে প্রতিটি কবিতায়।

বই: ঘুমের বাদ্যে রাষ্ট্র নাচে
কবি: শফিক হাসান
প্রকাশক: দেশ পাবলিকেশন্স
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রচ্ছদ: আল নোমান
মূল্য: ৩০০ টাকা।